আমি কার পথ চেয়ে

তারেক খান


আমাদের পাড়াটা পার হয়ে আমি যখন সালমাদের বাড়ির পাশ দিয়ে বিলে যাই, হয়ত গরুর ঘাস কাটতে, হয়ত কিষেনের খাবার নিয়ে, তখন প্রায়ই সালমাকে দেখি, হয়ত উঠোন ঝাড়—দিচ্ছে অথবা কল থেকে পানি নিচ্ছে। আমতলায় অন্যদের সাথে আম কুড়োয় মাঝে মাঝে। মাঝে মাঝে বরই, আমড়া, ইত্যাদি।
তাকে দেখলেই আমার বুকের ভিতর টিপটিপ করে। একথা লোকে জানলে কী মন্দই না বলবে। হয়ত এ কারণেই তাকে দেখলে এক সময় আমি মাথা নিচু করে ফেলতাম কিন্তু দেখার লোভ দিন দিন যেন বাড়ছেই। আবার ইশকুলে গেলে আমার শুধু রিতিকে দেখতে ইচ্ছে করে কিন্তু রিতি হল আমার এক ক্লাস ওপরে। ক্লাসমেট বা ওপরের কারো সাথে ত আবার এসব কিছু করা-টরা যায় না। ক্লাসমেট বলে কবিতাও তালিকা থেকে বাদ। তার নূপুরের সুর ত আর শুধু আমার কানেই বাজে না যে ওটা আমাকে উতালা করবে। তাহলে আমাদের নিচের ক্লাসে পড়ে যে লম্বা চুল মেয়েটি, নাম হল সাথি। কিন্তু বলি কিবায়। যদি রাজি না হয় আর নালিশ করে অথবা এই নিয়ে যদি সালিস বসে, সেই কেলেংকারি ঠেকাব কিবায়। আমি চাই না এই নিয়ে নালিশ হোক, সালিস বসুক বা কাইজা বাধুক। তাছাড়া ইশকুল থেকে বেতিয়ে একেবারে সোজা করে দেবে। তারপর হয়ত বেরই করে দেবে।
আমি ভেবে পাই না মেয়েগুলো রাজি না হলে সাথে সাথে নালিশ দেয় কিলায়। তুমি বাপু রাজি হও বা না হও, নালিশ দেয়ার কী হল। চুপ থাকলে তুমার সমস্যাটা কী। বিষয়টা নিয়ে অবিরাম ভাবনা কিন্তু মাথায় কোনো বুদ্ধি আসে না। অথচ ওদের কারো সাতে মেশার ইচ্ছা দিন দিন শুধু বাড়ছেই। একটা ছেলে আর একটা মেয়েকে একসাথে দেখলেই বাড়ে। বিয়ের খবর শুনলেও বাড়ে। বিয়েতে গেলে ত কথাই নেই। অথচ আমি হলাম ছোট মানুষ। বিয়ে করার প্রশ্নই ওঠে না। তহিদ আমার চেয়ে তিন-চার বছরের বড় অথচ বিয়ে করতে চাইলে সবাই তাকে কতই না মন্দ বলল আর তার বাপ ত তাকে বাড়ি থেকেই তাড়ায়ই দিল। তবু সে বিয়ে করেছে। এখন গরুর গাড়ি চালায়, বিলে কিষেন বেচে। কী দরকার বাপু বিয়ে করার। মিশলেই ত হয়। এই মিশামিশির নাম নাকি প্রেম। কিন্তু কাজটা ত ভাল না। সবাই নিন্দা করে। নাহ! এমন নিন্দার কাজ আমি করি কীর করে। কিন্তু—সালমা, ইতি, রাখি, অথবা—! হঅ, একজন না একজনের সাথে আমি—। যা বলে বলুক লোকে।
অনেক দিন তক্কে তক্কে থাকার পর মনে হল একমাত্র সালমাকেই সুযোগ আছে। ইতি-রাখি অন্য গ্রামের মেয়ে। সেখানে গিয়ে কি আর তাদের কাউকে ভাও করা যাবে নাকি। তাদের সাথে কেবল ইশকুলেই দেখা হয় কিন্তু ইশকুলে তাদের একা পাওয়া কঠিন, প্রায় অসম্ভব। একটু ফাঁক পেলেও কথা বলার আগেই কেউ না কেউ দেখে ফেলবে আর চিল্লিয়ে বলে দেবে সবাইকে। তারচেয়ে বরং সালমাকেই।
সালমা ইশকুলে যায় না বলে আরো সুবিধে। এক বছর আগে পাঁচ ক্লাস পাশ করেছে বলে তার ইশকুলে যাওয়া বন্ধ আছে। মেয়েঝিপুতের অত পড়ালেখার দরকার কী। চিঠিপত্তর ত লিখতে শিখেছে। ওর বর শহরে চাকরি করবে আর ও গ্রাম থেকে চিঠি লিখবে। অন্য অনেকের মত। আচ্ছা, আমিও ত ওর বর হতে পারি, কিন্তু সে ত অনেক পরের ব্যাপার। আমি এখনও ছোট। কেবল ছয় ক্লাস। সালমা আমার চেয়ে ছোট কিন্তু মেয়েরা ছোট হলেও বিয়ে দেওয়া যায়। ছেলেদের যে কী বিপদ—! আচ্ছা, সালমার যদি হঠাৎ বিয়ে হয়ে যায়—! সেদিন নাকি বিয়েটা প্রায় হয়েই গেছিল। ছেলে মেলেটারি। কিন্তু ছেলের দুলোভাই নাকি খেতে বসে বলেছে, সালমাদের পরিবার সভ্যভব্য না। গেঁয়ো, চাষাড়ে। তবে বিষয়টা আমার কাছে পাত্তা পেল না। সভ্যভব্য কিনা তা নিয়ে ত কাউকে মাথা ঘামাতে দেখি না। ওই ছেলেরা নাকি নাক-উঁচা। নাক-উঁচা হওয়া ত ভাল কথা না। আমি যদি মেলেটারি হতাম তাহলে কত সহজেই না সালমাকে বিয়ে করতে পারতাম। কিন্তু এখন আমি যেহেতু মেলেটারি হতে পারব না, ও নিয়ে ভেবে আর লাভ কী। কবে যে বড় হব। আনু সেদিন গিয়ে লাইনে দাঁড়াল আর অমনি মেলেটারি হয়ে গেল। তার কী কদর—! সে নাকি এখন সালমাকে বিয়ে করতে চায়। বিডিআর হলেও হয়। মেলেটারির চাইতে বরং বিডিআরের কদর বেশি। সায়েম দুই বছর আগে বিডিআর হইছে। কয়দিন আগে বিয়ে করল। তামাম দিন ভারত থেকে নতুন নতুন হিরো সাইকেল এনে এর-ওর কাছে বেচে কাঁড়ি কাঁড়ি টাকা জমাচ্ছে। বাড়িতে দালানকোটা দিচ্ছে। আমার আরো আফসোস হয় যে দুই বছর পরও আমি ওদের মত গিয়ে লাইনে দাঁড়াতে পারব না। আমাকে পড়তে হবে। পাশ দিয়ে অফিসে চাকরি করতে হবে। শায়লা ফুফুর কড়া হুকুম। আহা, আমার যে কী বিপদ—।
নাহ্, এসব ভেবে কোনো লাভ নেই। এখন আগে আমি সালমাকে চাই। এজন্য একটা উপায় আমাকে খুঁজতেই হবে।
ইশকুল-টিশকুল বাদ। সকালে খেয়ে উঠেই আমি সালমাদের বাড়ির পাশে বাগানে গিয়ে ঘুরঘুর শুরু করব যেখানে সে মাঝে মাঝেই খড়ি কুড়োতে আসে। যেদিন একা আসবে সেদিন কী করব, কী বলব মনে মনে মহড়া দিচ্ছি। কিন্তু তাকে দেখলেই আমার বুকের ভিতর যা কাঁপাকাঁপি শুরু হয়ে যায়। ভারি মুশকিল। কিছুতেই আর কিছু করা হয়ে উঠছে না। মনও মানছে না। কী যে করি। মনের মধ্যে সাহস জোগাতে হবে।
অনেক দিনের চেষ্টায় খানিকটা সাহস জোগাই। আমার বন্ধু মানোর মত আমিও সদম্ভে এগিয়ে যাব আর রাজি না হলে রেপ—। নাহ্। এমন নিন্দার কাজ আমি কি করতে পারি।
আরে ভুঁদাই, তুই ত শুধু হুমকি দিবি। কিডা তোরে রেপ করতি কইছে। তাহলে রাজি যদি নাও হয়, নালিশ করার আর সাহস পাবে না।
ও, তাই, তাহলে ত ঠিক আছে।
আমার খুব খুশি খুশি লাগছে। এতদিন পরে একটা বুদ্ধি পাওয়া গেল। এখন প্রস্তাব দেওয়া যায় নির্দ্বিধায়। কিন্তু যখন ভাবি সালমা যদি ভয় না পায় তখন কী হবে তখন আবার হতাশা। তার উপর শুনি যে আরেকজন মেলেটারি সালমাকে দেখতে এসেছে। পছন্দ হলেই বিয়ে করে নিয়ে যাবে।
মনটা আরো খারাপ হল। আমি অন্য বহুবারের মত আবার আমার বন্ধু মানোর শরণ নিলাম। মানো এখন কী দারুণ যখন খুশি মালেকার সাথে—। মালেকা যদি নালিশ করে তাহলে মানো তাকে খুন করার হুমকি দিছে। আমারও তেমনি লোভ হয় কিন্তু আমি হলাম ভিতুর ডিম।
নাহ্, আর আমি ভয় পাব না। সাহসী আমাকে হতেই হবে।
এবার আমি হুমকি দেওয়ার জন্য তৈরি। বন্ধু সলেমান আমাকে আরো একটা বুদ্ধি দিল। ভয় দেখানোর সময় আলেকজানের কথা বলতে হবে। আলেকজান রাজি না হলে মফিজ তাকে রেপ করল। তারপর আলেকজান নালিশ দিলে তার বাপ গ্রামে সালিস বসাল কিন্তু আলেকজানের লাভটা কী হল? মফিজের পাঁচ হাজার টাকা জরিমানা হয় বটে, আলেকজানের বাপ পায় মোটে দুই হাজার, বাকি টাকা মাতুব্বররা খেয়ে ফেলে আর আলেকজানের আজও বিয়ে হয়নি। মফিজ দিব্যি তার মামাতকে বিয়ে করে এখন বছর বছর বাচ্চা পয়দা করছে।
আমি সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেললাম।
অনেক দিন চিন্তার পর আমার মনে হল, রাজি না হয়ে সালমার আর উপায় কী, একবার রেপ করলে কে আর তাকে বিয়ে করবে। আমার অসীম ভয়ের কারণে সময় যতই গড়ায় বুদ্ধিটা ততই পছন্দ হয় বলে সিদ্ধান্ত নিতে আর একটুও দ্বিধা হল না, কিন্তু হঠাৎ করেই আমার চাচাত রশিদ ভাইয়ের কথা মনে পড়ল।
রশিদ ভাই হামিদাকে চোখ মেরেছিল বলে তাই নিয়ে গ্রামে সেকি হুলুস্থুল কাণ্ড। পরে বলেছিল সে তাকে বিয়ে করতে চায় কিন্তু হামিদার ভাইয়েরা রশিদ ভাইকে কী মারটাই না দিল। আর তার জেরও কী ভয়ানকই না হয়েছিল। আমার বাপ-চাচা আর চাচাত-খালাতরা মিলে দশ মিনিটের মধ্যে হামিদার বাপ-চাচাদের এমন শায়েস্তা করে দেয় যে তারা প্রায় বাপের নাম ভুলে যায়। এর কোনো কার্যকারণ সূত্র আমি এখনও আবিষ্কার করতে পারিনি বটে, লোকমুখে শুনি যে রশিদ ভাইয়ের মত একটা চাষার সাথে নয় ক্লাসে পড়া সুন্দরী হামিদাকে বিয়ে দেওয়ার প্রশ্নই ওঠে না। কিন্তু মানো আমাকে আরে দূর ভুঁদাই বলে বুঝিয়ে দেয় যে রশিদ একটা আহাম্মক, তা না হলে রশিদকে থুয়ে হামিদার কেন ডিমের ব্যাপারির সাথে বিয়ে হবে।
তা ত।
রশিদ ভাই সারা বছর পার উপর পা তুলে বসে থাকে মোটামুটি জমিদারের মতই। নিজের জমিতে মাঝে মাঝে একটু কাজ করলে কি তাকে চাষা কয় নাকি।
আর হামিদার বর কী করে?
সারাদিন ঝাঁকা মাথায় গাঁওগ্রামে ঘুরে ঘুরে ডিম কিনে বেড়ায় আর সকালবেলা নড়ালের বাজারে চাটি পাতে।
রশিদ ভাই নিতান্তই আহাম্মক বলে সবকিছু গুবলেট করে ফেলেছিল।
তা ঠিক। আমি ত আর রশিদ ভাইর মত আহাম্মক না।
তখন আমি কেবল চার ক্লাসে পড়ি কিন্তু ভাল করেই শিখেছি চোখ মারা মহা বেয়াদবি। শুক্কুরবার দুফোরে মানোসহ অন্যদের মত আমিও মসজিদে যাই আর শীতের সন্ধেয় ইসলামি জলসায় হাজির হওয়ার লোভও আমার যথেষ্টই। একশ একটা পাকা বেতের ডোররা বা পাথর ছুড়ে হত্যার বিষয়-আশয় কি আমি ভাল করেই জানি না? তবু ফুটুর দোকানের সামনে বসে সিনেমায় নায়কের চোখ মারার গপ্প শুনে আমারও খুব লোভ হয়। মানোর কাছে চোখ মারা শিখে নিয়ে প্র্যাকটিসও করেছি অনেক দিন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত এমন একটা জঘন্য বেয়াদবি আর আমি করতে পারিনে। আমি আমার বাপ-মার নিরীহ সভ্য শান্ত ভদ্র বাছুরটি। আমি যখন বুনো ভূত হয়ে বনে বনে ঘুরে বেড়াই তখনও সভ্যভব্য। কিন্তু এরকম হয়ে থাকলে ত আর চলছে না।
চোখ মারা আর রেপ করার হুমকির মধ্যে পার্থক্যটা আমার মাথায় তখন এভাবে কাজ করল যে চোখ মারলে মেয়েরা তার প্রতিক্রিয়ায় রেগে যায় কিন্তু রেপ করার হুমকিতে ভয় পায়।
এতদিন পরে আমি খুব ফুরফুরে হয়ে উঠলাম। এবার কাজ হবে। এবার নিশ্চয় সালমার সাথে আমি—।
আমি সালমাকে খুঁজে বেড়াচ্ছি কিন্তু একা পাচ্ছিনে। বাগানে তাকে প্রায়ই খড়ি কুড়োতে দেখি বটে, অন্যরা সাথে থাকে।
আবার আমাকে সেই মানোই উদ্ধার করল। আরে ভুঁদাই, দল ধরে আসে ত হইছে কী, সবাই কি গায় গায় মিশে থাকে নাকি যে—।
তাই ত—!
কী আশ্চর্য, পরদিনই তাকে আমি একা পেয়ে গেলাম। দূর থেকে দেখেই আমার বুকের ভিতর কেঁপে উঠল। কিন্তু সে যতই কাছাকাছি আসছে ততই কেন উদাস হয়ে যাচ্ছি।
এখন আর একটুও কথা বলতে ইচ্ছে করছে না। আমার বরং কানের মধ্যে কবিতার নূপুর সুর তুলছে।

—০—