তারেক খান
নাহ্! আজ মনে হয় দিনটা সুবিধের হবে না। মানোর মা
যেভাবে চিল্লাছে এই সকাল বেলা, তাতে—।
‘এএই শুয়োরের বাচ্চারা! উরি মা রে! মাজায়
আবার চোট লাগল গো! শুয়োরের বাচ্চারা সবাই—!’
চিল্লিয়েই যাচ্ছে মানোর মা।
খ্যাড়ের মত চুল, মাটিরাঙা থলথলে দেহ মানোর
মা ওরফে মাজুবিবি। শোয়া থেকে উঠে বসল। একগুচ্ছ চাবিআঁটা আঁচল টেনে নিয়ে ঝনাৎ করে পিঠের
উপর।
আমি খুব চিন্তায় পড়লাম। এমন চিল্লাচিল্লি
চললে সে বাড়ি কি আর বসা যায়। বসে থাকা ঠিকও না। কিন্তু আমি আমার বন্ধু মানোর দেখা চাই।
মাজুবিবির ছোট ছেলে এগার বছরের ছিপছিপে
সায়েম তামাটে ঠোঁটে বিড়বিড় করছে, ‘সাত-সকালে শুরু করিছে বুড়িখুন্তি। চলবেনে রাইত দুফোর
পন্ত! বুড়ির মুহি যদি অ্যাটটা তালা লাগাতি পারতাম—!’
‘কী কস, এই শুয়োরের বাচ্চা?’ মাজুবিবি দরজার
দিকে কান বাড়ায়। খাট থেকে নামার সময় পায় চোট লাগলে ‘উরি মা রে গিলাম রে’।
‘মঅর শুয়োরের বাচ্চা!’ সায়েমের রাগ হয়,
‘বুড়োধুড়ো হইছে, এটটু চুপচাপ থাকবে কি কি—তা না—সারাদিন খালি—!’
সায়েম তার লাল-নীল চেক প্যান্ট আর নীলচে
পলেস্টার জামা গায়ে ঘর থেকে বেরোল। বারান্দার বেড়ায় ঝুলানো তক্তা থেকে টান দিয়ে নিল
কয়খান বই আর একটা খাতা। তারপর বগলে চেপে থপথপ করে পা বাড়ায়। ‘সে নাকি ন্যাকাপড়া শিখতে
চায়।’
‘এই বিহানবেলা বকাবকি অরিস ক্যা, এই মাহেন্দারের
বাচ্চারা—?’ সায়েমের বাপ, লম্বা পাতলা খলিল পরামানিক, বারান্দায় উঠতে উঠতে মাথা থেকে
টুপি খুলল। তারপর রান্নাঘরের দিকে চেয়ে ‘বউমা কুহানে গিলে?’
‘এই যে আব্বা!’ পুকুর থেকে কলসিকাঁখে আগায়
আসে চব্বিশ বছরের বউমা। শাড়ি পরা যৌবন টপটপ বউমা ওরফে শাহিদা বেগম। সংসার সামলাতে হিমশিম
বেচারি।
ঘরের চৌকিতে ঘুমানো দুচার বছরের তিন পিচ্চির
কান সজাগ হয়ে গেছে ততক্ষণে। তাদের মাথার মধ্যে আপলোড হচ্ছে বেলা ওঠার সকালটা।
‘এই টুপিডা এটটু সাফ করে দিয়ো দিন!’ খলিল
তার কিস্তি টুপিটা খাটের উপর রেখে দড়ি থেকে টেনে নিল একটা পাঁচকলি টুপি। তারপর, ‘ছানো-মানো
গেল কুহানে?’
‘আছে ওই পাশে। আসতিছে।’
প্রথমে ছানো, একটু পরে মানো বাগান থেকে
বের হয়ে আসে মাটির বদনা হাতে। বদনাটা রান্নাঘরের কানাচে রেখে ধানের গোলার পিছনে যায়
শাহিদার বর ছানো পরামানিক। গুয়োল থেকে দুটো বলদ বের করে তাদের কাঁধে জোয়াল জুতে তাড়ায়
দেবে বিলের দিকে।
উঠোনের মাঝখানে মেহেরখুঁটিতে এসে হেলান
দিয়ে দাঁড়াল ছানোর ভাই মানো। সাথে সাথে তার চোখ চলে যায় গোলপাতা ছাওয়া বড় ঘরের খিলানাকার
চালের উপর দিয়ে, যেখানে আকাশে আগুন ছড়ায় একদল শিমুলগাছ। আগুনের মত রাঙিয়ে দেয় মানোর
মন-পরান।
আমি মানোর কাছে আগায় গেলাম। আমিও তাকালাম
তার মত। কিন্তু আমার চোখ আঁটল না সেখানে। আমি বরং মানোর মুখের দিকে তাকাই। কিছু বলার
আগেই মানো বলল, সে এখনই বাড়ি থেকে বেরোলে তার মা আরো চিল্লাতে পারে। তাই, ‘তুই চলে
যা। এটটু পরে ওই জাগায় চলে আসিস।’
তা ঠিক। আমিও ত তাই ভাবছিলাম।
‘সেই কবে ধরে প্যাঁচাল পাড়তিছি, আমারে এটটু
বদ্যির কাছে নিয়ে চল, আমারে এটটু—। তা কেউ আমারে এটটু—!’ কুঁজো বুড়ি মাজুবিবি ঘর থেকে
বেরোতে গিয়ে দরজার উপর পড়ে পড়ে। ‘উরি মা রে’ করে কঁকায় আর উঠোনের দিকে চায়। মানোকে
আকাশের দিকে প্রায় হাঁ করে চেয়ে থাকতে দেখে তার পিত্তি জ্বলে যায়। ‘এই মাহেন্দারের
বাচ্চা! আসমানের দিকিন চাইয়ে রইছির ক্যা? আমারে এটটু বদ্যির কাছে নিয়ে যাবিনে? উঁউঁউঁহ্!
আঁ—আঁ—আঁ—হ!’
‘বুড়ির হইছে কী? রাইত পুহাতি না পুহাতি—!’
মানো বলছিল। খাটে বসা বুড়ো খলিল খেজুরগুড় দিয়ে মুড়ি খেতে খেতে বলে উঠল, ‘বুড়ির শায়োয়
বিগের উঠিছে, নায়তো—!’
‘আঁললাঁ আঁমাঁরে মঁউঁতঁওঁ দেঁয় নাঁ—আঁ—আঁ—!’
মাজুবিবি কানতে শুরু করল। একটু পরে উঁউঁউঁহ্ আঁহ্ করে কঁকায় আর শাহিদাকে আশা করে। কাল
বিকেলে ঝগড়া করেছে বলে শাহিদাকে ডাকতে না পেরে বেশি করে কঁকাচ্ছে।
শাহিদা চাল ধুয়ে চুলোয় আগুন দিয়ে এসে হাত
ধরলে ওঠে মাজুবিবি। মানো পরশু দিন তাকে বদ্যির কাছে নিয়ে যেতে চেয়েছে। তবু বুড়িখুন্তি
মোটে থামে না বলে রাগ হয় শাহিদার। এমনিতেই দৈনিক সকালে বিলে ভাত পাঠাতে দেরি হয় বলে
দুপুরে ছানো এসে বকে। গরু-ঠেঙানো লাঠি দিয়ে ঠেঙায় মাঝে মাঝে। ইদানীং আবার বুড়িকে সকালে
হাত ধরে নিয়ে হাগানু মুতানু ধুয়ানু মুছানু লাগে।
একটা পিচ্চি ঘর থেকে বের হয়ে দোড়োয় গেল
শাহিদার কাছে। এক হাতের পিঠ দিয়ে চোখ ডলে আর অন্য হাতে জড়িয়ে ধরে শাহিদাকে। তার বাপ-দাদারা
যেমন করত ছেলেবেলায়। আরেকটা পিচ্চি বারান্দার কোনায় বসে খুঁতখুঁত শুরু করল।
‘কী হইছে? কানতিছির ক্যা?’ শাহিদা পেছন
ফিরে চায়। তারপর ধমকে ফিরিয়ে দিয়ে আবার হাঁটে।
খলিল পরামানিক মানোর দিকে কিছুক্ষণ চেয়ে
থেকে ধমকে উঠল, ‘এই, তুই বিলি যাবিনে?’
মানো তাড়াতাড়ি বারান্দায় উঠে মাথাল আর কোদাল
নিয়ে হাঁটা দেয় বটে, ঘরের কানাচে রেখে পিছন দরজা দিয়ে আবার ঘরে ওঠে। কটকটে লাল একটা
জামা গায় দিয়ে বেরিয়ে পড়ে। বাগানের মধ্যে সরুপথ ধরে গিয়ে দাঁড়িয়ে থাকবে রাস্তার ধারে
আকাশ-রাঙানো শিমুলতলায়।
আজ আমি তার সাথি হব।
মানো শিস দেয়ার সাথে সাথে আমি বাড়ি থেকে
বের হই। যোগ দিই তার সাথে। তারপরে আমরা দুই দোস্ত দখিন দিকে খানিক এগিয়ে খালেক মাশটেরের
বাড়ির দিকে নজর রাখি বাগানের আড়াল থেকে। খালেকের বউ তার মেয়েদের গলা চড়িয়ে শাসন করছে।
‘আর এটটু পরে আসলি ভাল হত। ইশকুল শুরু হআর
দেরি আছে অহনও।’ মানো বলছিল। আমি চুপচাপ তার মুখের দিকে তাকালাম। আমার বুকের ভিতর কাঁপছে।
মানো আমার সাথে কথা বলে আর আমি চুপচাপ দিব্যি
দেখতে পাই সালোয়ার-কামিজ পরা কবিতার চেহারা। মানোর অবস্থা খারাপ। ইশকুল শুরু হবার আগে
আর ছুটির পর রাস্তার ধারে দাঁড়িয়ে থাকে অনেক দিন ধরে। আজ আমি তার সাথি।
কবিতা পুকুর থেকে নেয়ে ভেজা কাপড়ে দোড়োয়
ফিরছিল অন্দর উঠোন দিয়ে। শলার ঝাড়ু দিয়ে উঠোন শুরতে শুরতে চেঁচিয়ে উঠল তার মা, আমেনা
বেগম, খালেক মাশটেরের বউ। ‘মাইয়ের ভাবসাব ত আমার মোটেও ভাল ঠেকতিছে না! বারবার কই যে
মাইয়ে-মানুষ এত জোরে হাঁটতি হয় না! কবরে গছফে না! ভাতারের ভাত জোটফে না কপালে! তবু
মাইয়ে আমার—!’
আমেনা কঠোরভাবে শাসন করলেও মাঝে মাঝেই বেয়াড়া
হয়ে যায় কবিতা। রক্ত যেন ঝরনার মত বয়ে চলে তার অজানতেই। প্রায়ই সে তা টের পায় না।
ঝাড়ু ফেলে কাপড়ের আঁচলটা কোমরে গুঁজে দিল
আমেনা বেগম। বড় ঘরের বারান্দার সামনে গিয়ে ফের চিল্লিয়ে উঠল, ‘বলি, আমার কথাটথা কি
তুমার কানেটানে যায় এটটু, নাকি বাগদি বিটির মতন একা একা খালি চিল্লাই? বারবার কচ্ছি
যে মাইয়ে বড় হইছে! বিয়েটিয়ে দিয়ে দ্যাও! তা না! মাইয়েরে ন্যাকাপড়া শিখেতি হবে! ন্যাকাপড়া
শিখেয়ে মাইয়েরে উনি—!’
সাদা পাঞ্জাবি আর পাজামা পরা খালেক মাশটের
ঘর থেকে নেমে চুপচাপ বাইসাইকেলে উঠল। আমেনার সাথে কথা বলতে গেলে তার রাগ লাগে ইদানীং।
বউডা দিন দিন কেমন যেন ঝগড়াটে ঝগড়াটে হয়ে যাচ্ছে। মেয়ে মানুষের বয়স বাড়লে নাকি এমনই
হয়। মনে মনে কথা বলতে বলতে চলে যায় খালেক মাশটের।
ভেজা কাপড়টা বদলাতে বদলাতে কবিতার চোখমুখ
অন্ধকার হয়ে ওঠে। সব সময় শিষ্ট থাকতে না পারায় নিজের উপর কিঞ্চিৎ রাগও হয়। মাথার মধ্যে
অ্যালজাবরার যে সূত্রগুলো ঘুরছিল তা হারিয়ে গেলে কান্না চাপে। তার মনে হল, ইশকুলের
যেসব পড়া মুখস্থ করেছিল তাও সব হারিয়ে গেছে। পড়া না পারলে সাররা—মেয়েদের মারে না বটে—যেভাবে
লজ্জা দেয়—: “কয়দিন পরে শ্বশুরবাড়ি চইলে যাবিনি—!” তার উপর বাপের কণ্ঠ বাজে কানের মধ্যে,
অঙ্ক আর বিজ্ঞান ভাল করে না শিখলে ডাক্তার হওয়া যায় না। কিন্তু অ্যালজাবরার সূত্রগুলো
বারবার যেভাবে তালগোল পাকায়—! আর জ্যামিতি মুখস্থ করা কি যা-তা কথা নাকি।
কাপড় বদলানো হয়ে গেলে বইখাতা গুছিয়ে একটা
খাতা খোলে কবিতা। বীজগণিতের কটা সূত্রের উপর চোখ বুলিয়ে নিয়ে চোরের মত পা বাড়াবে। মাটি
যেন কিছুতেই টের না পায়।
বইখাতা সব বুকের সাথে চেপে ধরে সামনের দিকে
কিঞ্চিৎ ঝুঁকে মাটির দিকে চেয়ে হেঁটে আসছে কবিতা। দূর থেকে তাকে দেখেই আমার বুকের ভিতর
টিপটিপুনি শুরু হয়ে গেল। আমি একটু সরে গাছের আড়ালে দাঁড়ালাম। ‘আইজ এর অ্যাটটা বিহিত
কিন্তু করতিই হবে!’ মানো বলল গত কদিনের মত।
আমার বুকের ভিতর টিপটিপুনি বাড়ছে।
‘কিন্তু উপায় কী?’ মানোর মাথায় বুদ্ধি খেলে
না। আগের মতই বলে, ‘ছেমড়ি ত আমারে মোটে পাত্তাই দেয় না।’
আমার চোখের সামনে কবিতার কানের দুল নেচে
উঠল।
‘ভয় দেখালে কাজ হতে পারে, তাই না?’ মানো
তাকাল আমার মুখের দিকে। তবে আপন মনে বলে চলল, ‘ছেমড়ির অত দেমাগ কিসির তাই আমি আইজ না
দেহে ছাড়তিছি নে!’
কবিতা কাছাকাছি এসে পড়লে আমি বাগানের ভিতর
ঢুকে পড়ি। কিন্তু আজ যেন তার নূপুরের নিক্বণ ভেসে এল আমার কানের মধ্যে যা আমি ভুলে
গেছিলাম।
মানো লাফ দিয়ে গিয়ে কবিতার সামনে দাঁড়ায়।
কবিতা দুরু দুরু বুকে চোখ তোলে। কিন্তু মুহূর্তের মধ্যেই তার চোখমুখ শক্ত হয়ে ওঠে।
‘পথ ছাড়িস কিন্তু!’
‘না ছাড়লি কী অরবিনি?’ মানো আজ সহজেই চেতে
যায়। কবিতার একেবারে গায়ের উপর গিয়ে পড়ল যেন। ‘আমি তোরে ভালবাসি। তোরে ছাড়া আমি—!’
অন্যদিনের মত আজ আর মানোর ‘তুমি’ বলতে মনে
থাকে না। তার চোখমুখ শক্ত দেখে কবিতাও দমে যায়। ‘আমার ইশকুলের সময় হয়ে গেছে, পরে কথা
কবানি’ বলে পাশ কাটিয়ে যেতে চেষ্টা করল। বিষয়টা কাউকে না বললে আর হচ্ছে না। কাকে বলা
যায় ভাবে। আগেও ভেবেছে বটে, কাউকে না পেয়ে চুপ আছে। যাকে বলবে সে উল্টো তাকেই খারাপ
বলবে তা সে জানে।
‘তুমি মেয়ে ভাল না বলেই ছেলেরা তুমাকে জ্বালায়।’
মানো ঘুরে দাঁড়িয়ে পথ আগলায়। ‘যা কবা আজই
কয়ে যাও! তুমারে ছাড়া আমি বাঁচপো না!’
কবিতার মাথার ভিতর চক্কর দিয়ে উঠল চাষার
বাচ্চার কথা শুনে। তার ভোঁতা নাক আর মেওয়া ফলের মত মুখটা কবিতাকে আরো চেতায়। মুখ ঝামটা
মেরে বলে, ‘মরার শখ জাগিছে? আইজ যদি তোরে আমি—! দাঁড়া! এহনই যাইয়ে আব্বারে কচ্ছি। তোর
ঘাড়ে কয়ডা মাথা হইছে—!’
মানোর মেজাজ গরম হয়ে গেল। তাকে সে দুহাতে
জড়িয়ে ধরল।
কবিতার গা কাঁপে। চিল্লিয়ে ওঠার চেষ্টা
করে কিন্তু মানো তার মুখ চেপে ধরে। কিশোরীদেহের উষ্ণতায় রক্ত চঞ্চল হয়ে ওঠে মুহূর্তেই।
ভয় দেখানোর কথা আর মনে থাকে না। বরং তার নারীত্বের ঘ্রাণ তাকে যেন মাতাল করে তোলে।
এক হাতে মুখ চেপে আরেক হাতে টেনেহিঁচড়ে নিয়ে যায় বাগানে।
আমি আরো পিছিয়ে বুনোঝোপের আড়ালে দাঁড়ালাম।
আমার গা কাঁপছে মানোর কাণ্ড দেখে। কবিতার সাথে যে এমন কিছু করা যায় তা ত আমি স্বপ্নেও
ভাবিনি। মানো তার সাথে প্রেম করতে চায়—প্রেম মানে কী—সে তাকে বিয়ে করতে চায়—বিয়ে মানে
কী—এবং কবিতাকে মানো—এসব আমার সচেতন মনে আগে কখনও জায়গা পায়নি?
আমার মনে পড়ে জানাজানি হলে কপালে কতটা খারাবি
আছে। জানাজানি যে হবেই তাতেও আমার সন্দেহ নেই। মানোও কি তা জানে না? না জানার কোনো
কারণ আছে কিনা তা আমার ভাবনায় আসে না। আমি অবশ হয়ে ভাবি, কবিতার সাথে মানো এ কী করছে।
কবিতা কি আকলি নাকি।
আমি একটু পরে ফিরে যাই কী ঘটছে দেখার জন্য।
যা ঘটার ঘটে গেছে। ওড়না দিয়ে চোখমুখ বান্ধা
কামিজ ছেঁড়া কবিতা চিত হয়ে পড়ে আছে ঘাসের উপর।
মরে গেল নাকি?
মরবে কেন তা আমার মাথায় আসে না কিন্তু বুকের
ভিতর ধড়ফড় করে লাফাতে থাকে। ভাবি, না মরলে অমন করে পড়ে আছে কেন।
ভাবনা আগায় না বেশি দূর। আশপাশে মানো আছে
কিনা দেখি। দেখা যায় না। আমিও করণীয় কিছু বুঝতে পারি না। কী ঘটেছে আর কী ঘটবে তা আমার
মাথায় ঠিক ঠিক ঢুকছে না।
আমি এখন কী করব। কবিতাকে এভাবে ফেলে রেখে
চলে যাব নাকি।
ইশকুলমুখী দুই বালিকা গপ্প করতে করতে এদিকেই
আসছে। আমি চুপিচুপি পিছিয়ে ইশকুলে যাব কিনা ভাবতে ভাবতে দোড় দিলাম। সাথে সাথে শুনতে
পাই দুই বালিকার ভীত-কম্পিত আর্তচিৎকার।
আমার মা উঠোনের পাশে মাটির জালায় ধান সেদ্ধ
করছিল। আমাকে দেখেই একটা কুঞ্চির লাঠি নিয়ে তাড়া করল। ‘এই শূকরের বাচ্চা! সকালে এক
ডিশ খাইয়ে অমনি কুহানে গিছিলি ইশকুলি না যাইয়ে?’
মানোর মা মানোরে কয় শুয়োর, শুয়োরের বাচ্চা।
আমার মা আমারে কয় শূকর, শূকরের বাচ্চা। আমরা মানোদের চেয়ে ভদ্দরনোক কিনা। কবিতারা আবার
আমাদের চেয়ে ভদ্দরনোক। প্রথম ভাষাশিক্ষাকালে প্রতিনিয়ত বিভ্রান্ত হতাম যে আমি আসলে
শূকর না শুকুর। অনেক দিন আগেই নিশ্চিত হইছি, আমি আসলে শূকর না, শুকুর আলি। যখন তার
কথামত না চলি তখন আমি তার শূকর আর যখন চলি তখন শুকুর আলি।
আমি দূরে দাঁড়িয়ে বললাম, ‘যাচ্ছি ত—!’
‘যাচ্ছি ত মানে কী? কয়ডা বাজে অহন? অহন
যাইয়ে কি ক্লাস ধরতি পারবিনি?’
‘পারবানি!’ পারব না জেনেও বললাম।
মা খানিক বকাঝকা করে ফিরে গেল।
আমি বইখাতা নিয়ে রওনা হই বটে, প্রথম ক্লাসটা
রমেশ সারের মনে পড়ায়, ওই সারের ক্লাসে যদি তার আগে না ঢুকতে পারি ত খবর আছে ভেবে চিন্তায়
পড়ি। তারপর আজ আর ইশকুলে যাব না ভেবে বাড়ি ফিরি চুপিচুপি।
মাচার উপর মাটির কলসির ভিতর লুকিয়ে রাখা
দুইটা পাঁচ টাকার নোট আর দুইটা ডিম নিয়ে রওনা হই শ্রীপুরের উদ্দেশে।
ছোট্ট বাজারে রবির সিনেমা-ঘরে দৈনিক দুপুরে
শুরু হয় সিনেমা প্রদর্শনী। প্রতিটা সিনেমা প্রতিবার প্রতিজন পাঁচ টাকা। ব্যাটারি-চালিত
বড়সড় একটা সাদা-কালো টিভিতে দেখা যায় রাজ্জাক-শাবানা আর আরো কত কত নায়ক-নায়িকার সিনেমা।
কী যে সুন্দর সিনেমার মেয়েগুলো!
আমার বুকের ভিতর টিপটিপ করে ওঠে। কবিতার
কথা মনে পড়ে খুব।
চলতি পথে গ্রামের মাঝখানে ফুটু ঘোষের দোকানে
গিয়ে ডিম বেচলাম। শালার বেটা শালা দুইটা ডিমের দাম দিল মোটে দুই টাকা। হাটের দিন হলে
কম করে হলেও আড়াই টাকা বেচা যেত। কিছু করার নেই। মার ভাঁড়ার থেকে চালডাল-ডিমডাম যা
চুরিচামারি করা যায় তা হাটে বেচায় ঝুঁকি আছে। কেউ যদি দেখে ফেলে আর বাপকে যদি বলে দেয়—!
আর সেই সুযোগটাই নেয় ফুটু শালার বেটা।
যাহোক। ওসব নিয়ে এখন আর ভাবার সুযোগ নেই।
আমি কবিতার কথা ভাবতে ভাবতে দোড় দিলাম। একটু পরেই বারবার মনে পড়তে লাগল, এই বুঝি পেছন
থেকে কেউ দোড়োয় এসে ধরে ফেলল। তবে একবার যদি এই বিলটা পার হতে পারি তাহলে আর ধরে কে।
শ্রীপুর হচ্ছে বিলের ওপারে। সে বহুত দূর।
কেউ ধরল না। তবু অনেক চিন্তাভাবনা করে বিকেলে
আর বাড়ি না ফেরার কথা ভাবি আমি। যদিও বুঝি সন্ধেয় ফিরলেও ঝামেলা আছে। কবিতা সংক্রান্ত
কোনো সমস্যা না হলেও মা ধরবে আচ্ছামত। রাতে খেতে দিতে চাইবে না। তবে শেষ পর্যন্ত অবশ্য
না দিয়ে আর পারবে না তাও জানি। খানিক বকাঝকা করবে, এছাড়া আর ত কিছু না। ইদানীং আর মাইর
দেয় না। মা নিজেই কয়, ‘বুড়ো ধামড়া হইয়ে গেছে! মারতিও ত পারি নে!’
আরেকটু বড় হওয়া দরকার গো। তাহলে আর শাসনও
করতে পারবে না কথায় কথায়। ছোট থাকার কী যে বিপদ!
একদিকে বিকেলে বাড়ি ফেরায় সমস্যার আশঙ্কা,
অন্যদিকে তিনটের প্রদর্শনীতে অন্য একটা সিনেমা দেখার লোভ।
শেষ পর্যন্ত আরেকটা সিনেমা দেখি আমি।
কি ন তু। হায়—! আমি ভাবলাম কী আর হল কী।
বাড়ি ঢোকার সাথে সাথে বাপ আমার ঘাড় মটকে
ধরল। ‘এই চুদার ভাই! কুহানে ছিলি সারাদিন?’
আমি কোনো উত্তর খুঁজে পাই না। তার উপর মা
কয় কিনা, ‘ঘাড় ধইরে বাইর কইরে দ্যাও! যিহান দে যা ইচ্ছে তাই করে বেড়াক গে!’
মার কথায় আমি একেবারে ভড়কে যাই। এর আগে
দেখেছি, বাপ সচরাচর মাথা ঘামায় না আমাকে নিয়ে। সে তার দাদার আমলের সুদের কারবার নিয়ে
সারাদিন এগ্রাম ওগ্রাম ছুটোছুটি করে আর অনেক দিন পরপর একদিন আমাকে ধরলেও মা অন্তত চুপ
থাকে। তাও প্রথমে। তারপরে আবার ঠেকিয়ে দেয় বাপকে, দুএক সময় ধমকও লাগায়। যেহেতু আমি
তার ‘ছোট্ট ঝিপুতটা’, আমাকে আদর করে আগলে ধরে। তবে আমার মনে পড়ে, এমনটা ঘটত অনেক অনেক
আগে। ইদানীং আর তেমন একটা ঘটে না। আমি বড় হয়ে গেছি?
গরু-ঠেঙানো বাঁশের লাঠি আর হাতের পোঁছা
দিয়ে খানিক ঠেঙিয়ে বাপটা থামে বটে, মা আর থামতে চায় না। তার মুখ চলতেই থাকে। তার পরানটা
যেন জ্বলে যাচ্ছে আমার অবাধ্যপনায়।
নাহ্! আজ আমার বড় দুর্দিন। কাল থেকে ঠিকঠাক
পড়ালেখা করা লাগবে।
যখন ঠিকঠাক পড়ালেখা করি, বাপ কোনো কাজের
কথা বললেও মা তাকে থামিয়ে দেয়। বাপও কথা না বাড়িয়ে থেমে যায়। কিন্তু ইশকুলে যে যাব,
মাননান সার তো—! শুয়োরের বাচ্চা একটা আজরাইল। আবার রমেশ সার—! ওই হারামজাদাটাও ত কথায়
কথায়—! একটু কিছু না বুঝলে অমনি সপাৎ সপাৎ। বাঞ্চতটা আবার কয়দিন আগে জোড়াবেতের ছড়ি
বানাইছে। মহা মুশকিল।
আমার দোস্ত মানো কী সুন্দর যা খুশি তাই
করতে পারে। পড়ালেখা করা লাগে না। কয় বছর আগে ইশকুলে যাওয়া বাদ দিলে তার বাপ সেকি খুশি!
আর আমার বাপ একটা—! কী আর কব। বাপের ধাতানি খেতে খেতে জীবনটা বরবাদ হয়ে গেল গো! আর
মাও তেমনি! গত বছরও ত ইচ্ছে হলে পড়তাম, ইশকুলে যেতাম; না ইচ্ছে হলে না। কেউ কিছু বলত
না। একদিন মুকা মাশটের—শালার বেটা শালা—বাপকে আর মাকেও কী কী যেন পড়াল। তার পর থেকে—।
যাহোক।
মা-বাপের চোদন খেয়েও আমার মনে শান্তি লাগে
যে কবিতার ব্যাপারে আমার নাম ওঠেনি।
রাতে খেয়েদেয়ে আমি বড় ঘরের কাঠের বেড়ায়
সাঁটানো কাঠের খড়খড়িঅলা জানালা খুলে জোছনা দেখতে দেখতে ঘুমিয়ে পড়ি। ক্লান্তির চাপে
এলোমেলো স্বপ্ন দেখি সারারাত। সিনেমার নায়ক-নায়িকারাও মাথার মধ্যে ঘুরতে থাকে ঘুমের
ঘোরে।
ভোরে মুয়াজ্জিন আজান হাঁকলে বাপ নিজে বিছানা
ছেড়ে আমাকেও ডেকে তুলল। মসজিদে গিয়ে নামাজ পড়তে হবে। গোল বাধল তারও পরে। মোনাজাত শেষে
মসজিদ থেকে বেরোতে বেরোতে বুড়ো আশরাফ বলল, ‘খালেকের মাইয়েডার কী হল তা ত আর শুনতি পাললাম
না রে—! তুরা কেউ কিছু জানিস নাকি?’
এই আমি প্রথম জানতে পারি কবিতা হাসপাতালে
আর শুধু মানোর ব্যাপারে সালিস হবে। আমার নাম ওঠেনি। যাক বাবা, এ যাত্রা বাঁচা গেল।
তবে বিষয়টা নিয়ে আমি অবিরাম ভাবতে থাকি। কবিতার জন্য আমার পরান পুড়ছে। তার প্রতি একটু
একটু ভালবাসা অনুভব করছি। হাজার হলেও, দোস্তর প্রেম-প্রস্তাবে সাড়া না দিলেও, কবিতা
আমার সহপাঠী ত।
আর। তার কোলাহল, তার পা, তার নূপুরের নিক্বণ
কি হঠাৎ করে ভেসে আসতে শুরু করল নাকি। এসব আমি ভুলে যা্ইনি?
নাহ্! দোস্ত শালার বেটা কাজটা ঠিক করেনি।
শালা বাঞ্চত একটা। ওর সাথে আর মেশা যাবে না। শালার বেটা শালার বিচার হওয়া উচিত। একশ
একটা ডোররা খেয়ে দেখুক কেমন লাগে। তয় শানটু ভাই ত আবার ওসব নিষেধ করে দিয়েছে। সরকার
নাকি আইন করেছে যে ডোররা আর মারা যাবে না। মাদারচোত সরকার।
বেলা বেড়ে উঠলে আমার মনের মধ্যে ভয় শুরু
হয়। যদি মানো আমার কথা বলে বসে! অথবা কবিতা—! ইশকুলে আমি অনেক দিনই যার সাথে ভাব করার
চেষ্টা করেছি। তার দিকে তাকালে, তাকে দেখলেই আমার যেন কেমন কেমন লাগে। কিন্তু সে কাউকে
পাত্তা দেয় না। একদিন বরং খুব একটা ধমক দিয়েছিল আমার দোস্ত শিহাবকে। সেদিন লজ্জায় আমার
মাথা কাটা গেল।
যাহোক।
কী করা যায় ভাবতে ভাবতে ফুফুবাড়ি বেড়াতে
যাওয়ার বায়না ধরলাম। মানো যেহেতু পলান দেছে, আমারও আপাতত পলায় থাকাই উচিত। ইশকুল কামাই
হবে বলে মা খানিক বকাবকি করবে। শেষ পর্যন্ত রাজি না হলে পলান দেব।
কবিতার দুই চাচা আর কয় চাচাত ভাই তক্কে
তক্কে ছিল, কবে মানো বাড়ি ফেরে। ফেরার সাথে সাথে ধরবে তারা তাকে। কিন্তু সুমন্দি মোটে
বাড়িই আসছে না। তা কুটুমবাড়ি কুটুমবাড়ি পলায় আর কদিনবা থাকবে সুমন্দির বাচ্চা সুমন্দি।
বাড়ি ত একদিন না একদিন আসবেই।
মানো ভেবেছিল, রাগ মানুষের কদিনবা থাকে।
ঝাড়া দুইটা সপ্তা মামাবাড়ি-খালাবাড়িসহ নানা জাগায় গা ঢাকা দিয়ে থেকে এক বিকেলে বেরিয়ে
পড়ে।
আন্দাজ তার ঠিকই ছিল। বিকেলে বের হলে গ্রামে
ঢুকতে রাত গভীর হয়ে যাবে। কিন্তু মনের ভুলেও ভাবল না রাত শেষ হলে কী হবে।
অন্ধকার রাতের গভীরতা অনুমান করতে না পেরে
দূর থেকে ফুটুর দোকান পরখ করে। না, আলোটালো কিছু দেখা যাচ্ছে না। তার মানে ফুটু দোকানি
ঘুমিয়ে পড়েছে। তার মানে রাত যথেষ্ট হয়েছে। পথেঘাটে নিশ্চয় কেউ নেই।
মানো দোকানের পাশ দিয়ে চুপিচুপি পা বাড়াল।
দোকান বা আশপাশের কোনো বাড়িতে টুঁ শব্দটি নেই। মানোর বুকে সাহস বাড়ছে। নির্দ্বিধায়
হাঁটা দিল কিন্তু আরো একটু এগিয়ে কেবল যখন কচি খাঁর বাড়িটা পার হচ্ছিল, কবিতার মেজো
চাচা মান্দার শিকদের টর্চের আলো ফেলে বলল, ‘কিডা যায় রে এত রাত্তিরি?’
মান্দারের কণ্ঠ শুনেই মানোর পিলে চমকে যায়।
যেখানে বাঘের ভয় সেখানে রাত হলে যা হয়। মানো ভোঁ দোড়। আর যায় কই, মান্দার সাথে সাথে
ঝাঁপিয়ে পড়ে আর ‘চোর ধরিছি চোর’ বলে চিৎকার। তারপর তার টর্চের আলো পড়ল মানোর মুখের
উপর।
‘ও রে! এ যে মোগো মানো রে!’
আশপাশের লোকজন ছুটে এল হইচই করে। ছুটে এল
কবিতার চাচা আর চাচাত দলে দলে।
সবাই মিলে বেদম মার দিয়ে মানোকে প্রায় অচল
করে ফেলল। কিন্তু এটুকুতে কেউ খুশি হতে পারে না। লোকের ভিড় থেকে তারা তাকে নিয়ে যায়
শিকদেরদের সদর উঠোনের সামনে কাচারি-বাড়িতে। আরো কয় ঘা লাগানোর পরে হাতে-পায়ে গরুর দড়ি
আর মুখ বান্ধে লাল গামছায়। তারপরে অন্ধকার কাচারি-ঘরের মেঝেতে ফেলে মোটা মোটা কাঠের
দরজা বন্ধ করে দেয় বাইরে থেকে।
মানো গুটিশুটি মেরে পড়ে ছিল। ভাবছিল, বড্ড
ভুল হয়ে গেছে। আরো পরে বাড়ি ফেরা উচিত ছিল এবং গ্রামে ঢোকার পর আরো সতর্ক থাকা দরকা
ছিল।
একদল লোক ভিতরে ঢুকল। ‘এই, তা তুই এতদিন
কুহানে ছিলি রে? ‘ভাবিছিলি যে পলায় থাকলি অমনি বাঁচা যাবেনে, তাই না? অহন তোর কোন বাপে
ঠেকাবেনে শুনি? ‘এত কথার দরকার কী? ভাইঙ্গে-চুইরে গুঁড়ো করে ফেলাও! ‘না, আর মারার দরকার
নেই। মইরে যাবেনে। ‘তা ও বাল মরলি তা আমাগে কী? ‘তার চাইতে বরং ধোন কাইটে ছাইড়ে দ্যাও।
আর কোনো দিন যাতে—! ‘হঅ, তাই ভাল! ‘আর কেউ একজন যাইয়ে শানটু ভাইরে এটটু খবর দে দি যে
শুয়োরের বাচ্চাডা আইছে! কাইলই সালিস বসাতি হবে। ‘আরে সালিস-টালিস আবার কিসির? মারা
ত হইছেই। আরো খানিক ঠেঙ্গানি দিয়ে ধোন কাইটে ছাইড়ে দ্যাও! ‘হঅ, তাই ভাল। ধর সুমন্দিরে।’
তিনজন মিলে মানোকে কাত করে ধরল আর অন্য
একজন দোড়োয় গিয়ে নিয়ে এল তালগাছ কাটার ছুরি।
বেদম মার খাওয়ার পর বেচারা মানোর গায় এমনিতে
আর বল নেই। তার উপর ধরেছে তিনজন। তালগাছ কাটার ছুরি কুপির আলোয় চকচক করছে। মানো চোখ
বুজে ফেলল। বান্ধা মুখেই চিল্লিয়ে উঠতে গেলে মুখ চেপে ধরে কবিতার চাচাত হারুন।
‘শালার বিটা আবার চিল্লায়। ভালমত ধর শালারে।’
আরো দুইজন যোগ দিল। মানোর দুইপা দুইজন দুইদিকে
টেনে ধরে, দুইজন দুই ঊরুর উপর ঝুঁকে ঠেসে রাখে, আরো দুইজন বুক চেপে ধরে মাটির উপর।
অন্যজন খাসি জবাই করার ভঙ্গিতে প্রস্তুত।
‘কী হল, করিস কী তুই?’
একজন ধমকে উঠলে আর দেরি করে না কবিতার চাচাত
যুবক বকুল। মানোর নুনুটা মুঠ করে টেনে ধরে বাঁ হাতে আর ডান হাতে চি করে একটা পোচ দেয়।
তারপরে হাসতে হাসতে উঁচু করে ধরে মানোর চোখের সামনে।
‘হো হো ! ‘হে হে ! ‘হা হা !’ সবাই মিলে
হররা করে উঠল।
মানো চোখ বড় করে চেয়ে। সময়-অসময় যেটা ফালদোল
দিয়ে উঠত সেটা এখন বকুলের হাতে। ছোট্ট জোঁকের মত। মানো কিছুতেই বিশ্বাস করতে পারে
না যে জাগামত ওটা আর নেই। চিনচিন করে ব্যথা শুরুর আগপর্যন্ত দেখে মানো। তার মাথার মধ্যে
আন্ধার হয়ে আসে। বুকের মধ্যে শূন্যতা বেড়ে ওঠে হুহু করে। ব্যথা বাড়তে বাড়তে অজ্ঞান
হবার আগ পর্যন্ত দেখে। শেষ দেখা।
প্রায় প্রৌঢ় আনজু শিকদের ও আরো কজন মানোর
ঘাড়ের উপর দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখে আর খ্যাকখ্যাক করে হাসে। তবে খুব শিগগিরই তাকে থামতে
হয় বাইরে থেকে কোলাহল ভেসে এলে। কোনো কিছু বুঝে ওঠার আগেই মানোর ভাই ছানোর হুঙ্কার—‘ধঅঅর
শুয়োরের বাচ্চাগে’—আলুথালু করে ফেলে সবাইকে।
কবিতার বাপ-চাচারা তৈরি হবার আগেই ছানোরা
ঢুকে পড়ে তাদের পাড়ার মধ্যে। ঘরের কোনা দিয়ে অন্দরে ঢুকে রামদা চালায় এলোপাতাড়ি। মানোর
ভাই ধিঙ্গি সায়েম উত্তেজিত হয় আরো বেশি। নাভির নিচে মাঝে মাঝে কুড়কুড় করার অনুভূতি
আর নুনু কাটা-পড়ার পরিণতি তাকে ভাবিয়ে তোলে। যেমন উত্তেজিত করে তেমনি শিহরিত। বড় একটা
রামদা দুহাতে ধরে মাথার উপর তুলে পাগলের মত ছোটে সে, কোপায় যেখানে-সেখানে। ঘরের বেড়া,
দরজা, মানুষ, গরু, যা তার সামনে পড়ে।
মানোর চাচাত তরুণ আজিজুল বাঁহাতে বেতের
ঢাল আর ডান হাতে সড়কি নিয়ে ছুটে ছুটে যায় দিগবিদিক।
আকস্মিক আক্রমণে জান নিয়ে পলায় শিকদের-বাড়ির
তরুণ-যুবারা। সেই সুযোগে চার-পাঁচটা দরজা ভেঙে ফেলে, তিনটা ঘরে আগুন দেয়, দুটো গরু
জবাই করে ফেলে রাখে পরামানিকরা এবং নির্বিঘে উদ্ধার করে নুনু-কাটা মানোকে। তবে তারা
বাড়ি পৌঁছানোর আগেই পুবপাড়ার মণ্ডলদের সাহায্যে পালটা হামলা চালায় শিকদেররা।
আন্ধারে জুত করতে পারে না কোনো পক্ষই। তারা
বরং পরদিন সকালের জন্য তৈরি হয়।
তখন শুরু হবে আসল খেলা। এই উত্তেজনায় দুই
দল যুবা প্রৌঢ় তরুণ কিশোর যুবতী কিশোরী সবাই মিলে তির ধনুক বল্লম রামদা আর ঢাল-সড়কি
নিয়ে তৈরি থাকে সারারাত। পালা করে ঘুমায় আর শুধু সকালের অপেক্ষা। ভোরে চলে আরো জোর
প্রস্তুতি। ঠিকমত খেয়েদেয়ে ইশকুলের মাঠে গিয়ে হুঙ্কার ছাড়বে।
‘পারিস ত চলে আয়!’
‘তুরা পারিস ত চলে আয়!’
হঠাৎ একদলের একজন উত্তেজিত হয়ে ছুটে যাবে।
যে যাকে পাবে ঠেঙ্গাবে আচ্ছামত। এলোপাতাড়ি ঠেঙ্গাঠেঙ্গি, ছুটোছুটি চলবে ঘণ্টার পর ঘণ্টা।
খুন হবার আগ পর্যন্ত।
কি ন তু।
শালার বেটা শালা শানটু বাধাল গোল। কোত্থেকে
খরব পেয়ে ভোরবেলা এসেই ধমক। তর্জন-গর্জন শুরু করল। কয় কিনা এসব আর করা যাবে না। এসব
নাকি অনেক কাল ধরে অনেক অনেক হইছে। বলে কিনা এখন দেশ গড়ার সময়। নিজেদের মধ্যে মারামারি-খুনোখুনি
করে নাকি শুধু পশুরা!
বাঞ্চতটা খুব শিক্ষিত হয়ে গেছে! দুই দলকে
ইশকুলের মাঠে নিয়ে দুই পাশে বসাল। কারো সাথে একটা কুঞ্চির লাঠি পর্যন্ত নিতে দিল না।
কেউ কেউ দাঁড়ায় থাকার চেষ্টা করলে সে তাকে বসিয়ে দিল মিঠে-কড়া সুরে, প্রায় জোর করে।
আর সে নিজে বসল দুই দলের মাঝখানে একটা কাঠের চেয়ারে।
আমিও অন্য কিশোর-বালকদের মত আসরের এক কোণে
চুপটি মেরে দাঁড়িয়ে। এতদিনে নিশ্চিত হইছি, আমার নাম আর উঠবে না। মাঝে মাঝে ধিঙ্গি বালক
সায়েমের সাথে ফিসফাস করছি। হঠাৎ এক বালকের মুখে আমার নাম শুনে কান খাড়া করলাম। তারপর
কেটে পড়ার জন্য চুপিচুপি পিছু হটি।
ইশকুল-প্রাঙ্গণ পার হবার আগেই আমার ডাক
পড়ল। আমি টুপ করে একটা গাছের আড়ালে দাঁড়াই। অমনি আমার বাপের হুংকার, ‘ফের যদি আমার
ছাওয়ালের নাম নেছো তো—!’
আমার বুকের ভিতর দুরুদুরু। ঝেড়ে দোড় দেব
কিনা ভাবছি। কিন্তু এখানে গাছপালা বেশি নেই। একটু নড়লেই কারো চোখে পড়ে যাব। ওদিকে বাপের
এক হুংকারে সবাই চুপ। আমার মনে হল সবাই দ্বিধাগ্রস্ত। বাপের সাথে ওদের মারামারি বেধে
যাবে কিনা ভাবছি।
একটু পরে শানটু ভাই বাপকে শান্ত করল যে
কবিতা ত আর আমার নাম বলেনি। ‘কবিতা কি শুকুর আলির নাম কইছে?’ ‘না।’
একটুখানি স্বস্তি পাই। আবার যেন সবকিছু
স্বাভাবিক হয়ে উঠছে।
শিকদের আর পরামানিক। দুই পক্ষেরই মাতুব্বর-স্থানীয়
লোকেরা তারার মত গোল হয়ে বসে নিজেদের মধ্যে আলাপ-আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে। তাদের ঘিরে
রেখেছে নিজ নিজ পক্ষের তরুণ-যুবা আর বালকেরা। থেকে থেকে গর্জে উঠছে অপদস্থ হবার কষ্টে।
কোনো পক্ষই অন্যপক্ষের দিকে নজর দিচ্ছে
না মনের ভুলেও। শানটুর কথায় কান দেওয়া তাদের মোটেও উচিত হয়নি বলে মত দিচ্ছে উভয় পক্ষের
কেউ কেউ।
কবিতা রান্নাঘরের পিছনে আমগাছে হেলান দিয়ে
একা একা ভাবছে, তাকে নিয়ে এত কিছু—! লোকেরা বলাবলি করছে, মেয়েমানুষ নিয়েই দুনিয়ার সবচেয়ে
বড় বড় অঘটন ঘটে। এই ‘অপমান’ কি সহ্য করা যায়।
দুপক্ষের মাঝখানে কাঠের চেয়ারে বসা শানটু
ভাই আপন মনে সিগারেট টানছে। পায়ের উপর পা তুলে দিল। ‘আসেন গো! আপনারা আর গোস্বা কইরেন
না।’ মাঝে মাঝে বলছে কিন্তু কেউ পাত্তা দিচ্ছে না। অনেকক্ষণ চিন্তার পর প্যান্টের পকেট
থেকে একটা স্টার সিগারেটের মোড়ক বের করে শানটু ভাই। চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়িয়ে বাড়িয়ে
ধরে শিকদের-পক্ষের সামনে। ‘নেন, সিগারেট খান! মাথা ঠাণ্ডা করেন।’
‘আমরা তো—!’ শিকদের-বাড়ির মাতুব্বর-স্থানীয়
তহসেনের রাগ পড়ে যায় হঠাৎ করে। তা শানটু ভাইর মত একজন মানুষ মুখের সামনে এভাবে সিগারেট
ধরলে কি আর রাগ করে থাকা যায় নাকি।
তহসেন লাজুক হেসে হাত বাড়ায়। তার চোখেমুখে
পুলক ঝরে। ‘বিড়িটিড়ি খাই’ হারিয়ে যায় ঠোঁটে আসার আগেই।
‘খাইয়ে দ্যাহেন অ্যাটটা!’
‘হঅ, দেহি। অ্যাটটা খাইয়ে দেহি!’ একটা সিগারেট
নিয়ে মোচ করে ঠোঁটে চাপে তহসেন।
মোড়কটা শানটু ভাই গোমড়া মুখে বসে থাকা খালেক
মাশটেরের সামনেও বাড়িয়ে ধরে, কিন্তু খালেকের মুখটা আরো গোমড়া হয়। তাই দেখে আবার চুপসে
যায় তহসেন। তার মুখটাও খালেকের মত গোমড়া হয়ে ওঠে। গোমড়া হয়ে ওঠে অন্য শিকদের মুখগুলো।
তবে সিগারেট চেখে দেখার লোভ সামলাতে পারে না প্রায় কেউই। একটা করে সিগারেট নিয়ে ঠোঁটে
চেপে পুলক ভাঁজে। এতখনে তারা আড়চোখে দেখার চেষ্টা করে পরামানিক মুখগুলো।
শিকদেরদের পরে শানটু ভাই আরেকটা মোড়ক খুলে
পরামানিকদের সামনে বাড়িয়ে ধরল। মোড়কটা তাদের হাতে হাতে ঘুরে বেড়ায় নিঃশেষ না হওয়া পর্যন্ত।
বিড়ি বা হুঁকোর বদলে সিগারেট কেমন করে সুখ
ছড়ায় খেয়াল করে শানটু ভাই। খানিক স্বস্তি পায়। অন্তত কথা বলার মত একটা অবস্থা হচ্ছে।
লম্বা করে দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে শুরু করল, ‘তাহলে এখন আমরা একটু কাজের কথায় আসি।’
সবাই নড়েচড়ে বসছে। শানটুর মুখের দিকে চেয়ে
সিগারেট টানতে টানতে কানগুলো সজাগ করে তুলছে।
‘কথা হচ্ছে যে—!’ সিগারেট টানে আর দুপক্ষের
মন বোঝার চেষ্টা করে শানটু ভাই। তারপরে মনে করিয়ে দেয়, একাত্তরেও এই গ্রামের নাম ছিল
দস্যুডাঙ্গা। গ্রামের বেশির ভাগ মানুষ যে দস্যু ছিল তা আর বলে না। সে জানে, দস্যুডাঙ্গা
বললেই সবাই বুঝে নেয়। মুক্তিযুদ্ধ শেষ হলে পরের বছর শানটু ভাই গ্রামের নামটাই বদলে
দেয়। দস্যুডাঙ্গার বদলে শিমুলগাঁও। সেই সাথে চালু করে একটা ইশকুল। নাম দেয় শিমুলগাঁও
প্রাথমিক ও নিম্নমাধ্যমিক বিদ্যালয়।
শানটু ভাই খোঁজ নিয়ে যখন জানতে পারে, এ
গ্রামের একমাত্র পাশ দেওয়া আদমি খালেক মাশটের ছেলেবেলা থেকে খুলনায় থাকে, এখন দাদা
ম্যাচ ফ্যাক্টরিতে কেরানিগিরি করছে, তাকে নিয়ে আসে শিক্ষা-আদর্শের কথা বলে। বানিয়ে
দেয় প্রধান শিক্ষক।
সেই ইশকুল আজ পূর্ণাঙ্গ হাইস্কুল।
সিগারেট টানতে টানতে কথা বলে আর লোকজনের
প্রতিক্রিয়া বোঝার চেষ্টা করে শানটু ভাই। না, কেউ আর নুনুকাটা মানো বা কবিতাকে নিয়ে
তেমন কিছু ভাবছে না। ঘরে আগুন লাগানো বা গরু জবাই করার বিষয়েও কেউ আর তেমন কিছু ভাবছে
না। বরং শানটুর কথা শুনতে মন দিয়েছে।
সুতরাং।
‘কথা হচ্ছে যে—!’ শানটু ভাই শুরু করে। যা
হবার তা ত হইছেই। দুই পক্ষেরই প্রায় সমান ক্ষতি হইছে। এ নিয়ে আরো হাঙ্গামা করে লাভ
কী। এখন কিভাবে ভাগ্যের চাকা ঘুরানো যায় তাই ভাবতে হবে সবাই মিলে।
‘সেইডা কী?’ শুরু করল এক যুবক।
‘বিষয়ডা হল গিয়ে—। ধরো যে মাহেন্দারি কইরে
আর কত কাল চলবা তুমরা? পানিতি ভিজে, রোদি পুইড়ে জীবনডা যে আঙ্গার হইয়ে গেল, তবু যে
ঠিকমত নায়া-খায়া নেই, পাছায় কাপুড় নেই, তা ত এটটু ভাবাটাবা দরকার, নাকি? আবার ধরো যে
রোগব্যাধি হয়ে মরতিছো সময়-অসময়, তার ত কোনো—!’ শানটু বক্তব্য ঝাড়ে শিমুলগেঁয়ে জীবনমান
নিয়ে। প্রায় সবাই আরও একটু সক্রিয় হয়ে চিন্তা শুরু করে। কিন্তু খালেক মাশটের চুপচাপ
মাথা নিচু করে পা বাড়ালে বিব্রত হয়ে পড়ে শানটু ভাই, করণীয় খুঁজে হয়রান হয়। তাড়াতাড়ি
উঠে গিয়ে তার হাত ধরল।
‘মাশটের সাব, আপনি শিক্ষিত মানুষ। আপনি
যদি একটু শক্ত না হন—। আপনি যদি মনঃক্ষুণ্ন হন তালি আমি কারে নিয়ে কাজ করব তাই কন।’
খালেক মাশটের চুপ।
‘আপনিই কন, কী বিচার চান? আপনি যা কবেন
তাই করব।’ ব্যাকুল হয়ে ওঠে শানটু ভাই।
খালেক চুপ। বলে না যে ‘বিচার দিয়ে আর কী
হবে’। তার বরং কানে বাজে আমেনার কণ্ঠ, ‘এই মাইয়ে নিয়ে তুমার কপালে কী যে ঘটবে—।’
‘খুদার কসম, মাশটের সাব! আপনি যা কবেন তাই
করব। আজ সন্ধের মধ্যেই।’
তা করার ক্ষমতা শানটুর আছে বৈকি। তবু চুপ
খালেক মাশটের। তার মাথার মধ্যে ঘুরে বেড়ায় কবিতাকে ধরাধরি করে বাড়ি নেওয়ার দৃশ্যটা।
‘কী হইছে? ‘কী হইছে? ‘এই কী হইছে রে?’
‘ভূত ধরিছে! ‘ভূত ধরিছে! ‘আরে ভূত ধরিছে!’
‘ভূত ধরিছে না ভিটকেরি ধরিছে?’
‘আরে দূর ভুঁদাই! ভিটকেরি ধরবে ক্যা? এ
কি তোর বিটি মানুষ নাকি? ঝিপুতপালা মানুষ।’
‘আরে ও আর ঝিপুত নেই! ‘হঅ, আটের ঘরে পড়ে!
বিয়ে দেয় না তা ভিটকেরি ধরবে না ত কী অরবে?’
ভূত বা জিন ধরলে এমনকি ভিটকেরি ধরলেও ত
সমস্যা ছিল না। পুবপাড়ার সালেহাকে রেপ করেছিল বাদল বাইরো। সে ব্যাপারে সবাই নিশ্চিত
ছিল। কিন্তু অনেকেই বলতে লাগল, ভূত ধরেছে।
সালেহাও অনেকক্ষণ চুপ থাকার পর চোখ খুলে
বলল, ‘ভূত!’
আর।
কবিতা।
জ্ঞান ফিরতেই মেয়েটা ‘মানো আমারে’ বলতে
বলতে আবার অজ্ঞান। খালেক ভাবে, অন্যরা আবার সাথে সাথে ‘মানো কুহানে...ধঅঅর শুয়োরের
বাচ্চারে’ বলে ঝাঁপিয়ে পড়ল। মুহূর্তের মধ্যে চাউর হয়ে গেল আসল খবর।
খালেক মাশটেরের বুকের ভিতর চিনচিন করে ব্যথা
ছড়ায়। উদাস চোখে চেয়ে থাকে গলাকাটা তালগাছের দিকে।
মাশটের সাব!’ খালেকের হাত ধরে ঝাঁকি দিল
শানটু ভাই। তার গোলগাল শামলা মুখখান আন্ধার হয়ে ওঠে। কিছুখন চুপচাপ। তারপরে শান্তস্বরে
বলে, ‘আপনি ভাইঙ্গে পড়লে কি হয়? একটু শক্ত হন, মাশটের সাব!’
শক্ত হয় না খালেক মাশটের। কদিন ধরে তৈরি
করা পরিকল্পনামত দিব্যি দেখতে পায়, বাকশপেটরা বেঁধেছেঁদে গাড়ি ভরছে তার লোকজন। পড়শিরা
ভিড় করছে সকাল থেকে। আমেনা আর কবিতারা কাপড়চোপড় পরে তৈরি হচ্ছে। দুই দুইটা গরুর গাড়িতে
বুঝাই হইছে খাট-পালঙ্ক, বিছানাপত্তর, ইত্যাদি।
আরেকটা গরুর গাড়িতে চড়ে বসল আমেনা আর কবিতারা
দুই বোন।
গাড়িগুলো চলতে শুরু করলে বাইসাইকেলে ওঠে
খালেক মাশটের। গ্রামের মধ্য দিয়ে, বিলের মধ্য দিয়ে এগিয়ে চলে গাড়িগুলো। তাদের পাছে
ধীরে ধীরে বাইসাইকেলে খালেক মাশটের। একটার পর একটা বিল, একটার পর একটা গ্রাম, তারপর
নড়াল ভিক্টোরিয়া কলেজের পাশ দিয়ে এগোয় গেলে রূপগঞ্জ বাসস্ট্যান্ড। বাসে উঠলে তিন ঘণ্টা
পরে খুলনা শহর। অনেক অনেক অলিগলি, অসংখ্য মানুষ। সেখানে কে কার খোঁজ রাখে।
শানটু ভাই চুপচাপ ভাবছিল। ঠিক তখনই হইচই
ভেসে এল শিকদেরবাড়ি থেকে। সেই সাথে বুকফাটা কান্না। কোলাহল করে ছুটে গেল সারা আসর।
শিকদেরবাড়ি। দেখতে দেখতে ভেঙে পড়ল সারা গ্রাম।
আমার বুকের ভিতর ঢিবঢিব করছে কেন। আমি নিরিবিলি
হেঁটে বাগানের আড়ালে গিয়ে দোড়। বাড়ি ফিরে ঝটপট বইখাতা গুছিয়ে চটের থলে কাঁধে।
‘আমি ফুফুবাড়ি যাব। ফুফু কইছে বইখাতা নিয়ে—।’
এই আচমকা ঘোষণায় মা খুব পুলকিত। আগে অনেক
বুঝিয়েও পাঠাতে পারেনি। অথচ পাঠাতে চায় মনেপ্রাণে। শিমুলগাঁয় থাকলে তার বাছুরটা যে
মানুষ হবে না তা সে নিশ্চিত। কিন্তু আমার এত তাড়াহুড়োর কারণ বুঝতে পারল না। বোঝার আগেই
আমি কেটে পড়তে চাই।
আমি প্যান্ট-শার্ট পরলে মা আরো অবাক হয়ে
বলল, ‘তা তোর আব্বারে এটটু কইয়ে যাবিনে, বাবা?’
আমি যখন তার শান্তশিষ্ট বাছুরটি হয়ে উঠি
তখন আমি তার বাবাও হই।
আমার বুকের ভিতর ঢিবঢিব বাড়ছেই।
‘তোর সাথে পড়ত—অত সুন্দর মায়েডা মইরে গেল—!
তা তারেও এটটু দেখতি যাবিনে?’
কবিতা মরে গেছে! আমি কি ভাবতে পারছি। আমার
বিশ্বাস হয় না। অ থ চ। ‘রান্না ঘরের পাছে আমগাছে গলায় দড়ি দিয়ে—।’ আমি দিব্যি দেখতে
পাই, আম গাছের ডালে ফাঁসিতে ঝুলছে কবিতা। আমার সহপাঠী, যাকে আমার খুব—।
আমার চোখের সামনে তার কানের দুল দুলে উঠল।
তার নূপুরের নিক্বণ ভেসে আসছে। আমার বুকের ভিতর হুহু করছে। চোখে পানি এসে যাচ্ছে। আমি
ডুকরে কেঁদে উঠলাম।
[প্রথম প্রকাশ : নতুনধারা, ২৫তম সংখ্যা,
নভেম্বর ২০১১]